স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল!
আপনি যেহেতু এই লেখাটি পড়ছেন,তাই ধরেই নিচ্ছি আধুনিক প্রযুক্তির যান্ত্রিক সমীকরণের সাথে তাল মিলিয়ে আপনি স্মার্টফোন নয়তো পিসি ব্যবহারে অভ্যস্ত। আমাদের এই যান্ত্রিক জীবন ব্যবস্থার যাতাকলে পিষে, ক্লান্তির সেই অবসর সময় টুকুর সদ্ব্যবহার করার জন্য,আপনি ও হয়ত প্রায়শ ফেইসবুক,টুইটার বা বিভিন্ন সাইট ভিজিট করে থাকেন। আর ঠিক তাই, আপনি রূপকথনের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত এই আর্টিকেলটি পড়ছেন ।
আধুনিক বিশ্বের এই ক্রান্তি লগ্নে এসে প্রযুক্তির উন্নতি সাধনের সাথে সাথে আমাদের অবশ্যই নিজেদের স্বাস্থ্য নিয়ে ও সচেতনতা আবশ্যক।
‘স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল’ ভাব-সম্প্রসারণ হিসেবে ছোটোকালে কম-বেশি সবাই পড়েছি আমরা। মুখস্ত বিদ্যা কিংবা সৃজনশীলতার দরুন নানান কথাবার্তা লিখে পাশ-মার্ক তুলেই হয়তো দায়িত্ব সেড়েছেন অনেকে, কেউ-বা আবার বুঝে-শুনেই যা লেখার লিখে বাস্তব জীবনেও তার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।
চারপাশে একটু নজর বুলালেই এ কথার সত্যতা কিন্তু আপনি নিজেই যাচাই করতে পারবেন। সকাল সকাল কিছু মানুষকে একসাথে দৌড়াতে দেখেছেন? কিংবা হাসতে? অনেকের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় প্রচুর তাজা শাক-সবজি, ছোটো মাছ এবং দেশীয় ফলের প্রাধান্য দেখতে পাবেন। কেন বলুন তো?
ঘুরে-ফিরে উত্তর কিন্তু ওটাই, স্বাস্থ্য! নিয়মতান্ত্রিক জীবন ও সুসম খাবারে যেটা পরিণত হয় সম্পদে। সুস্বাস্থ্যের চেয়ে বড়ো সম্পদ কি কিছু আছে? অসুস্থ হলেই কেবল বোঝা যায়, সুস্থ থাকার প্রয়োজনিয়তা কী। তাই নয়? স্বাস্থ্য এবং সুস্থ থাকা। এ দুটো বিষয় যে বিষয়টির সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত তার নাম খাবার। এই খাবারের সাথে আবার যে নামটি আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে তার নাম ডায়েট কন্ট্রোল।
আচ্ছা, ডায়েট কন্ট্রোলের নাম শুনেছেন? একটু মুটিয়ে যাওয়া কিংবা মোটা হওয়া থেকে দূরে থাকার জন্য অনেকেই কিন্তু ডায়েট কন্ট্রোলের দিকে ঝুঁকে থাকেন। সেই ডায়েট কন্ট্রোলের দুনিয়ায় সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা নামটি “কিটোজেনিক ডায়েট বা কিটো ডায়েট“।
বিঃদ্রঃ আপনার ব্যক্তিগত ডাক্তারের সাথে পরামর্শ না করে এই ডায়েট অনুসরণ করবেন না
কিটো ডায়েটের পরিচয়ঃ কী এই কিটো ডায়েট? [What is the Keto Diet?]

এক কথায়- ‘নো কার্বোহাইড্রেট!’ অর্থাৎ, এই কিটো ডায়েটের মূল উদ্দেশ্যই হলো শরীরে থাকা যাবতীয় কার্বোহাইড্রেটকে একদম নিঃশেষ করে ফেলা এজন্য কিটো ডায়েটে কার্বোহাইড্রেটকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়। আপনারা জানেন, মোটা হওয়ার জন্য কার্বোহাইড্রেট দরকার হয় শরীরে। তাই যারা চিকন হতে চান তাদের জন্য কিটো ডায়েটে এর ঠিক উলটো কাজটা করতে হয়। কার্বোহাইড্রেট জাতীয় সব খাবার এড়িয়ে যেতে হয়। যাতে শরীরে থাকা চর্বি পুড়তে শুরু করে এবং এক পর্যায়ে জমে থাকা কার্বোহাইড্রেটও পুড়তে শুরু করে। যার কারণে ওজন কমতে থাকে। মূলত কিটো ডায়েটকে সুপার লো-কার্ব ডায়েট বলে। ডায়েটটিতে কার্ব এক্সট্রিম লেভেলে কম থাকে, প্রোটিন মিড লেভেলে এবং ফ্যাট যথেষ্ট হাই থাকে।
টিপিকাল যে কিটো ডায়েট আছে সেখানে মোট ক্যালোরিক নিডের ফ্যাট ৭০%, প্রোটিন ২৫% এবং কার্ব ৫% থাকে। এর মানে হলো একটা পুরো দিনে আপনি যতটা খাবার খাবেন সেই খাবারের সুষম বণ্টনটা এমন হবে। একজন মানুষের স্বাভাবিক যে ডায়েট সেখানে কার্বোহাইড্রেট এর পরিমাণই থাকে ৫০%, ফ্যাট থাকে ৩০% এবং প্রোটিন ২০%। এখন আপনি যদি সারাদিনে ১২০০ ক্যালোরি খান তাহলে এর ৫০% কার্ব মানে ৬০০ ক্যালোরি কার্ব খেতে হবে আপনাকে।
মানবদেহের প্রধান খাদ্য বা জ্বালানি কী জানেন? গ্লুকোজ। আর কিটো ডায়েটের মূল উদ্দেশ্যই হলো এই গ্লুকোজের বদলে কিটোন বডিগুলোকে জ্বালানি বা খাদ্য হিসেবে প্রস্তুত করে ব্যবহার করা। খুব ইফেক্টিভ একটি ফ্যাট লস ডায়েট হিসেবে খ্যাত এই কিটোজেনিক ডায়েটটি মূলত প্রোটিন নির্ভর। অর্থাৎ প্রোটিন খাওয়াটাই কিটো ডায়েটের মূল উদ্দেশ্য।
তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই প্রোটিন দিয়ে মানবদেহের প্রতিদিনের ক্যালোরি নিড এবং রিকোয়ার্মেন্ট পূরণ করা সম্ভব হয় না সেক্ষেত্রে টোটাল ক্যালোরি নিডের ২০%-৩০% প্রোটিন এবং ৫% কার্ব খেয়ে শরীরের বাকি নিড এবং রিকোয়ার্মেন্ট পূরণ করতে হয়।
এতক্ষণের আলাপনে মোটামুটি একটা ধারণা এসেছে না কিটো ডায়েট সম্পর্কে? এমনও অনেকে আছেন যারা কিটো ডায়েট বলতেই বোঝেন প্রচুর মাংস গ্রহণ। আদতে বিষয়টা এমন না। আমাদের শরীরে ৬২% পানি, ১৬% আমিষ, ১৬% চর্বি, ৬% মিনারেল এবং ১% এর থেকেও কম কিংবা কাছাকাছি পরিমানের শর্করা, ভিটামিন এবং অন্যান্য কিছু উপাদান আছে।
কিটো ডায়েটের প্রকারভেদ [Types of Keto Diet]
এখনও পর্যন্ত চার ধরণের কিটো ডায়েট এর সাথে আমাদের পরিচয় ঘটেছে-
(ক) স্ট্যান্ডার্ড কিটোজেনিক ডায়েট – এ ধরণের ডায়েটে ফ্যাট ৭০%, প্রোটিন ২৫% এবং কার্ব ৫% থাকে। সাধারণত কিটো ডায়েট বলতে মানুষ এটাই বুঝে এবং এই স্ট্যান্ডার্ড কিটোজেনিক ডায়েটই বেশি পরিচিত এবং প্রচলিত।
(খ) সাইক্লিক্যাল কিটোজেনিক ডায়েট – সপ্তাহে দু’দিন-ই কার্ব খাওয়ার অনুমতি আছে এই কিটো ডায়েটে।
(গ) টার্গেটেড কিটজেনিক ডায়েট – প্রথম দুটি কিটো ডায়েটের তুলনায় এই কিটো ডায়েট একটু আলাদাই বটে। কতটা আলাদা সে প্রশ্নের উত্তরে বলতে হয়, এই কিটো ডায়েটে আপনি কার্ব খেতে পারবেন তবে সেটা বিশেষ ক্ষেত্রে। যেমন- ওয়ার্ক-আউটের আগে কিংবা পরে।
(ঘ) হাই প্রোটিন কিটোজেনিক ডায়েট – এই ডায়েটটি কিছুটা স্ট্যান্ডার্ড কিটোজেনিক ডায়েট এর মতো। কেবল প্রোটিনের মাত্রাটা কিছুটা বেড়ে যায়। কেমন সেটা? স্ট্যান্ডার্ড কিটোজেনিক ডায়েট এ প্রোটিন থাকে ২৫% আর এই হাই প্রোটিন কিটোজেনিক ডায়েটে প্রোটিনের পরিমাণ থাকে ৩৫%। অর্থাৎ পুরো বণ্টনটা হলো- ফ্যাট ৬০%, প্রোটিন ৩৫% এবং ফ্যাট ৫%। এথলেট এবং বডিবিল্ডারদের জন্য এই হাই প্রোটিন কিটোজেনিক ডায়েট খুব কার্যকর।
নতুনদের জন্য সহজ কেটোজেনিক ডায়েট এর খাবার পরিকল্পনা [Simple Ketogenic Meal Plan for Beginner]

কিটোজেনিক ডায়েটের এতক্ষণের আলাপনে কী খেতে পারবেন আর কী খেতে পারবেন না এটুকু জানার পরে ডায়েট চার্ট জানার ব্যাপারে সামান্য আগ্রহ জন্মেছে কি পাঠক? আগ্রহ জিইয়ে রাখার উপহার স্বরূপ এক সপ্তাহের কিটোজেনিক ডায়েট প্ল্যান, শুধু আপনাদের জন্য-
সকালে কী খাবেন?
অনেকের সকালে খাওয়ার অভ্যেস নেই, অনেকের আছে। যাদের আছে তারা সকাল ৮ টা থেকে সাড়ে ৮ টার মধ্যে দুধ এবং চিনি ছাড়া ১ কাপ চা খেতে পারেন। স্বাদ পেতে আদা, লেবু এবং সামান্য লবণ দিতে পারেন।
কুসুম গরম পানির সাথে অ্যাপল সিডার ভিনেগার অথবা কোকোনাট ভিনেগার মিলিয়ে খেতে পারেন। কিংবা লেবু চিপে রস বের করে নিয়েও মিশিয়ে খেতে পারেন।
যারা সকালের খাবার খেতে দেরি করেন, তারাও একই ভাবে বেলা ১১ টার মধ্যে উপর্যুক্ত খাবার খাবেন।
দুপুরে কী খাবেন?
দুপুরের খাবারের শুরুটা হবে অ্যাপল সিডার ভিনেগারের এক চামচের সাথে এক গ্লাস পানি। মিশিয়ে খাবেন। এতে গ্যাস হওয়া থেকে নিরাপদ তো থাকবেনই, সেই সাথে শরীরের চর্বি কাটাতেও এর উপকারিতা আছে।
দুপুরের খাবারে বাটার, শাক, সবজি, মাংস অথবা মাছ, ঘিয়ে ভাজা ডিম এবং বাদাম, শশা এবং টমেটোর সালাদ খাবেন। শাক, মাছ এবং সবজি এক্সট্রা ভার্জিন ওলিভ ওয়েল দিয়ে রান্না করে খাবেন। সবজি কম সেদ্ধ করবেন, এতে সবজির গুণগত মান অব্যাহত থাকে।
১ দিনে সর্বোচ্চ ৬ টা ডিম কুসুমসহ খেতে পারবেন। এতে সমস্যা নেই তাই ভয় পাওয়ার কিছু নেই। প্রোটিন এবং ফ্যাটের ভালো উৎস ডিম। কিটোজেনিক ডায়েট আপনাকে ডিম খাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। অতএব…
পাঠক, মাছ আর মাংস কিন্তু একই সাথে খাবেন না। ঠিক আছে? মাছ খেলে মাংস খাবেন না আবার মাংস খেলে মাছ খাবেন না। মুরগি (দেশি বা ফার্ম), উট, দুম্বা, ভেড়া, খাসি, গরু ইত্যাদি, অর্থাৎ যে মাংসই খান না কেন ১ টুকরো। বেশি নয়।
সকালে যারা ৮ টা থেকে সাড়ে ৮ টার মধ্যে সকালের খাবার খান, তরা চেষ্টা করবেন দুপুরের খাবার দেড়টার মধ্যে খেয়ে নিতে। আর ১১ টায় যারা খান, তারা আড়াইটা থেকে ৩ টার মধ্যে খাওয়ার চেষ্টা করবেন।
বিকালে কী খাবেন?
বিকালে খাওয়ার অভ্যেস থাকলে কিংবা ক্ষুধা লাগলে সকালের নাস্তার পুনরাবৃত্তি করবেন। চা, বাটার কফি, বাটার কিংবা ঘিয়ে ভাজা বাদাম ইত্যাদি খেতেই পারেন।
রাতে কী খাবেন?
রাত ৮ টার মধ্যে রাতের খাওয়া শেষ করবেন। দুপুরে যা খেলেন, এখানেও ঠিক তাই। খাবারের কয়েক পদ কম হোক, সমস্যা নেই।
যে ধরণের খাবার খেতে পারবেন না কিটো ডায়েটে! [Foods You Should Avoid on a Ketogenic Diet]
যত ধরণের ডায়েট কন্ট্রোল এর ব্যাপার আছে, প্রায় সবগুলোতেই সাধারণ কিছু বিধিনিষেধ আছে। তেমনই কিছু বিধিনিষেধ আছে কিটো ডায়েটেও-
(ক) মিষ্টিজাতীয় খাবার বাদ! সাথে চিনিও! সাদা চিনি, লাল চিনি বলতে কিছুই থাকবে না খাদ্য তালিকায়। মিষ্টিপ্রেমিদের জন্য দুঃসংবাদই বটে! তবে দুঃসংবাদের এখানেই শেষ নয়, আরও একটু আছে। কোকজাতীয় সব ধরণের ঠাণ্ডা পানীয়, সব ধরণের ফল ও ফলের জুস, কেইক আইসক্রিম, চকোলেইট, স্মুদি, যে-কোন ধরনের মিষ্টান্ন, ইত্যাদি নিষিদ্ধ। খেতেই পারবেন না।
(খ) আটার তৈরি খাবার অনেকের পছন্দের তালিকায় থাকে। একই সাথে ভাত,পাস্তা, নুডুলস, ওটস, কর্নফ্লেক্সও অনেকে বেশ পছন্দ করে খান। দুঃখের সাথে জানাচ্ছি কিটোজেনিক ডায়েটে এগুলোও বাদ!
(গ) বাঙালি মানেই মাছে-ভাতে-ডালে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়া এক অনুভূতি। কী তাইতো? অনেকে বেশ আয়েশ করে ডাল দিয়ে আলুভর্তা, ডাল দিয়ে আম এবং ডাল দিয়ে ডিম অমলেট খেতে ভালোবাসেন। এ ভালোবাসা দোষের কিছু না তবে কিটো ডায়েটে এ ভালোবাসা নিষিদ্ধই বটে! ডালে প্রোটিনের পাশাপাশি প্রচুর কার্ব থাকার কারণে কিটো ডায়েটে সব ধরণের ডাল বাদ!
(ঘ) প্রিয় পাঠক, মাটির নিচের সবজি খেতে কেমন লাগে আপনার? আলু, গাজর, কচু, ওল, মুলা, ইত্যাদি খেতে কেমন লাগে? সর্ষের তেল আর নতুন ওঠা ধনে পাতা দিয়ে ঝাল করে আলু ভর্তার স্বাদ পেতেই বা কেমন লাগে পাঠক? অমৃত নয়? এখানেও দুঃসংবাদ জানাচ্ছি, কিটো ডায়েটে এই মাটির নিচে হওয়া সবজি খাওয়া একদমই বারণ!
(ঙ) সর্বশেষ দুঃসংবাদ তাদের জন্য যারা প্রক্রিয়াজাত খাবার খেতে ভালোবাসেন! জি! ওটাও বাদ! কোন প্রক্রিয়াজাত খাবার আপনি কিটো ডায়েটে খেতে পারবেন না।
যে খাবার গুলো খাওয়ার অনুমতি আছে! [Foods that are Allowed to Eat!]
খাদ্যপ্রেমীরা হয়তো ভাবছেন, সবই যদি বাদ পড়ার তালিকায় যায় তবে খাবেন টা কী? কিংবা হয়তো ভাবছেন, কিটো ডায়েটে কি তবে না খেয়েই ডায়েট কন্ট্রোল করতে হবে? উত্তর হলো- ‘না!’ অনেক কিছু বাদ পড়লেও অনেক মুখরোচক কিছুই আছে যা আপনি এই কিটো ডায়েটে খেতে পারবেন। চলুন একটু জেনে নেওয়া যাক-
(ক) মাংসপ্রেমীদের জন্য সুখবর! কিটো ডায়েটে আপনি মাংস অর্থাৎ গরু এবং মুরগি খেতে পারবেন।
(খ) অনেকে মাংস অত পছন্দ করেন না। এবারের সুখবরটা তাদের জন্য! সব ধরণের মাছ আপনি খেতে পারবেন। বড়ো কিংবা ছোটো কোন বাছ-বিচার নেই। সব মাছ খাওয়া আপনার জন্য প্রযোজ্য। কী খুশি তো ফিশ-লাভারেরা?
(গ) বলুন তো পাঠক, কোন খাবারকে ব্যাচেলর্স ফুড বলা হয়? ডিম, তাইতো? ব্যাচেলর্স লাইফ, হল লাইফ, মেস লাইফ, সাবলেট লাইফে থাকা প্রতিটা মানুষের নিত্য দিনের খুব পরিচিত খাবার কিন্তু ডিম। ঘরে আর কিছু থাকুক বা না থাকুক, ডিম তো থাকবেই। ডিম ভাজি কিংবা ভর্তা করে দিনাতিপাত করে দেয় এমন অনেকেই কিন্তু আছেন। রান্নার ঝামেলা এড়ানো কিংবা সহজে প্রস্তুত করা যায় বলে ডিমের জনপ্রিয়তাও কিন্তু অনেক। আবার অনেকে ডিম খেতেও বেশ পছন্দ করেন। তো ডিম নিয়ে এত আলাপনের মাঝে একটা সুখবর দিয়ে রাখি, কিটো ডায়েটে আপনি ডিম খেতে পারবেন। জি ঠিকই পড়েছেন। ডিম খাওয়ার অনুমতি আপনি কিটো ডায়েটে পাচ্ছেন।
(ঘ) ঘি এবং বাটার কার না পছন্দ? ঘিয়ে ভাজা লুচি কিংবা পরোটার স্বাদ অমৃত-তুল্য অনেকের কাছেই। আর বাটার? সে তো আরেক ধাপ এগিয়ে। পাউরুটি এবং বাটার যেন মানিকজোড়। বলছি, এই বাটার এবং ঘি-ও আপনি খেতে পারবেন কিটো ডায়েটে!
(ঙ) বাদাম পছন্দ? খেতে ভালোবাসেন? বাদামের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জানলে এই জিনিস না খেয়ে থাকা অসম্ভবই হবে আপনার জন্য। কিটো ডায়েট এই অত্যন্ত পুষ্টিকর খাবারটি আপনার জন্য বরাদ্দ রেখেছে।
(চ) স্বাস্থ্য সম্মত যত তেল আছে, যেমন- অলিভ অয়েল, কোকোনাট অয়েল, ক্যানলা অয়েল, এর সবই খেতে পারবেন।
(ছ) সবুজ যত সবজি আছে, যেমন- পালং, ব্রকলি, বাঁধাকপি ইত্যাদির সবই খেতে পারবেন। তবে রংটা সবুজ হতে হবে।
(জ) মশলা খেতে পারবেন, প্রায় সবই। এতে মানা নেই।
কেন কিটো ডায়েট ভালো? [Benefits of Ketogenic Diet]
প্রায় হুট করেই বাংলাদেশে যেন কিটো ডায়েট বিষয়টা জনপ্রিয় হয়ে উঠলো। এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই কিটো ডায়েট আদতে কতটা ভালো আর কেনই-বা ভালো? উত্তর খুঁজতে কিছু বিষয়ের আলাপন জুড়ে দিচ্ছি-
- যদি প্রচুর ফ্যাট কমানোর ইচ্ছা থাকে তবে কিটো ডায়েটকে ভরসা আপনি করতেই পারেন! কারণ এই ডায়েটে খুব অল্প সময়েই অনেক ফ্যাট কমানো যায়।
- এই ডায়েটে ফ্যাট আর প্রোটিন গ্রহণের আধিক্যের কারণে পেট খালি থাকার সম্ভাবনাও থাকে না। অনেক বেশি প্রোটিন শরীরে থাকলে এমনিতেও ক্ষুধা পায় না। এজন্য ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে আনা খুব সহজ হয়ে যায়।
- মেদ কমে যাবে ঠিকই কিন্তু শরীরে পেশীর পরিমাণ ঠিক থাকবে।
- গবেষণা জানাচ্ছে, যে সকল মানুষ কিটো ডায়েটে অভ্যস্ত তারা টিপিক্যাল লো-ফ্যাট ক্যালোরির যত রেস্ট্রিক্টেড ডায়েট আছে, সে সমস্ত ডায়েটের চাইতে ২.২ গুণ বেশি ওজন কমাতে সক্ষম হয়েছেন।
- হার্ট ডিজিজ, ব্লাড প্রেশার, ব্লাড সুগারের রিস্ক কমায় কিটো ডায়েট। একই সাথে পিসিওএস এবং ডায়াবিটিস রোগীদের জন্যও ডায়েটটি বেশ কার্যকর। শুধু ওজন কমানো না বরং ইনসুলিন আর ব্লাড সুগারও নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ সাহায্য করে কিটো ডায়েট।
- তবে ভেজিটেরিয়ানদের জন্য কিটো ডায়েটটা আসলেই মুশকিলের ব্যাপারই বটে! কারণটা ইতোমধ্যে হয়তো বুঝেও গেছেন। কিটো ডায়েটে প্রোটিন যতটা গ্রহণ করতে হয় শাক-সবজি থেকে সেই পরিমাণটা সংগ্রহ করা আসলেই খুব কঠিন। আবার শাক-সবজিতে শর্করাও থাকে। কিটো ডায়েটে শর্করা আবার নিষেধ! সুতরাং একই সাথে শর্করা আর প্রোটিন, বুঝতেই পারছেন বিষয়টা আসলেই সাংঘর্ষিক।
আছে বিপরীত কিছু ঘটনাও! [Common Side Effects on a Keto Diet]
হঠাৎ জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই কিটো ডায়েট আদতে কতটা সুফল বয়ে আনে কিংবা কুফল, সে আলাপে যাবো না তবে একটা ডাক্তারের ঘটনা উল্লেখ করতে চাই। মন দিয়ে পড়ুন ,সিদ্ধান্ত আপনাদের!
মেয়েটির বয়স ৩০, উচ্চতা ৫ ফুট ৩। উচ্চশিক্ষিতা এবং একজন মা। দুটি ফুটফুটে সন্তানের জননী সে। জনৈক ডাক্তারের চেম্বারে গিয়েছিলেন তীব্র শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে অথচ তার পরিবারে শ্বাসকষ্টের কোন রোগী নেই! রিপোর্ট জানালো কিটো ডায়েটে আকৃষ্ট হয়ে ৫ মাস ধরে কিটো ডায়েট এ আছেন মেয়েটি। এই ৫ মাসে ৮ কেজি ওজন কমিয়ে ৭২ কেজি থেকে ৬৪ কেজিতে নামিয়ে এনেছেন। সবই ঠিক ছিল কিন্তু সমস্যা বেঁধেছে অন্য জায়গায়। ওজন কমলেও শরীরের নানান জায়গায় নানান রকম সমস্যার দেখা মিলছে। বুকের ভেতর অস্থির লাগা, শরীর দূর্বল লাগা, মাথা ঘোরা এবং কোষ্ঠকাঠিন্য। সব মিলিয়ে দিশেহারা মেয়েটি।
প্রশ্ন রাখছি, কী বুঝলেন? সবার কি সব সয়?
ডায়েট সম্পর্কে অনেকের ধারণা শূন্যেরও নিচে, এ আপনি জানেন?
ইউটিউব, গুগল ঘেটে অল্প সময়ে ওজন কমাতে অনেকেই ঝুঁকে যান কিটো ডায়েটের দিকে। নাম পালটে অনেকে লো কার্ব ডায়েট বলেও ফলাও করে প্রচার করছেন কিন্তু কাজ তো ঐ একই। কিন্তু সত্যি বলতে কী, আমরা অনেকেই ভুলে যাই যে আমরা আদতে মানুষ। হ্যাঁ, এটাও ঠিক মানুষ পারে না এমন কিছুই নেই। কিন্তু এটাও মাথায় রাখতে হবে যে জীবন একটাই! গেইমের মতো একাধিক লাইফ আমরা পাবো না ,তাই সব কিছু নিয়ে নিজের উপর এক্সপেরিমেন্টটা না চালালেই কী নয়?
না, আমি এও বলছি না যে কিটো ডায়েট ভালো নয়, বরং অনেকের কাজে এসেছে। কিন্তু যদি সর্বসাকুল্যে চিন্তা করতে যান, তাহলে কিন্তু এই কিটো ডায়েট আদতে সাধারণ কোনো মানুষের জন্য উপযুক্ত নয়। বিভিন্ন ডাক্তাররা অন্তত এমনটাই বক্তব্য দিয়েছেন। এখন কেন এই কিটো ডায়েট সর্বসাকুল্যে প্রযোজ্য নয়, সে বিষয়ে একটু আলাপের প্রয়োজন আছে বইকি! তো চলুন বিভিন্ন ডাক্তার এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত জেনে নেওয়া যাক-
আচ্ছা পাঠক, উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে এমন কাউকে দেখেছেন কখনও? এই মানুষগুলোর জন্য লবণ খাওয়া কিন্তু একদম নিষিদ্ধ! আবার ধরুন যিনি থাইরয়েড ডিজঅর্ডারে ভুগছেন, স্বাভাবিকভাবেই তার গ্লোটেনযুক্ত খাবার নিষিদ্ধ। একইভাবে গবেষণা করেই কিটো ডায়েটকে মূলত সাজানো হয়েছিল মৃগী রোগীদের থেরাপডিউডিক ডায়েট হিসেবে। প্রয়োজনীয় অনেক পুষ্টি উপাদানকে বাদ দিয়ে কেবল হাই ফ্যাট, হাই প্রোটিন এবং নামেমাত্র কিছু কার্বোহাইড্রেড দিয়ে সাজানো হয় এই কিটো ডায়েট। এই ডায়েট তৈরির নেপথ্যে ছিল মৃগী রোগীদের সুস্থতা। কিন্তু ঔষধ আবিষ্কারের আগে এই কিটো ডায়েটের সাইড ইফেক্ট প্রকট হয়ে ধরা দেয়। অতিরিক্ত ওজন হ্রাস, স্বাস্থ্য জটিলতা সহ ডায়েটটি গ্রহণযোগ্যতা হারাতে শুরু করে। আমাদের মস্তিষ্কের প্রধান খাদ্যই হচ্ছে শর্করা বা গ্লুকোজ যেটা আমাদের সারাদিনের অ্যানার্জি বহন করে। এখন আপনি চিন্তা করুন, এত প্রয়োজনীয় এই শর্করা বাদ দিয়ে অতিরিক্ত চর্বি যখন আপনি গ্রহণ করছেন শর্করার পরিবর্তে, তা আদতে কতটা কাজে দেবে? সাময়িকভাবে এটা হয়তো শরীরে থাকা অতিরিক্ত চর্বিকে পুড়িয়ে, ভেঙে ওজন কমিয়ে দেয় এবং শরীরে স্বাভাবিক মেটাবলিজমের বিরুদ্ধে হয়ত কাজও করে, তবে সেটা সাময়িক। কিন্তু দীর্ঘসময় ধরে এই অবস্থা চলতে থাকলে কিছু সমস্যা হয়। অতিরিক্ত ফ্যাট বার্ন হওয়ার দরুন কিটন বডি অতিরিক্ত তৈরি হয় যা প্রাথমিকভাবে রক্তে কিটোসিস এবং পরবর্তী সময়ে কিটোএসিডোসিসে রুপান্তরিত হয়। আর এগুলো রক্তের সাধারণ পিএইচ লেভেলকে একদম ক্ষতিগ্রস্থ করে ফেলে।
পড়ুন: ৩০ দিনে ওজন কমানোর কার্যকরী উপায়
কিটো ডায়েটের শুরুর দিকে প্রথম ২/৩ সপ্তাহ কোনরকমে ঝুঁকির বাইরে ফেললেও দীর্ঘমেয়াদী কিটো ডায়েট শরীরের জন্য মোটেও সুখকর কিছু না। মাথা ঘোরানো, মাথাব্যথা, বুক ধরফর করা, বমি বমি ভাব, শরীর ব্যথা, কাজে অমনযোগিতা, ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হ্রাস, সারাদিন পিপাসা পাওয়া, খিটখিটে মেজাজ ইত্যাদি দেখা দেয়। আরও ভয়ংকর তথ্য দেই পাঠক? হুট করে না জেনে-বুঝে এই কিটো ডায়েট অনুসরণ করে অতিরিক্ত চর্বি গ্রহণ করার ফলে রক্তে কোলেস্টেরল, এলডিএল, টিজি বেড়ে গিয়ে স্ট্রোক এবং হৃদরোগ এর ঝুঁকি বেড়ে যায়।
এখানেই শেষ নয়! অতিরিক্ত চর্বি গ্রহণের কারণে উপর্যুক্ত সমস্যা তো আছেই, বাড়তি হিসেবে যোগ দেয় ডায়রিয়া। আবার ডায়েটে ফাইবার কম থাকায় কোষ্ঠকাঠিন্যকে বোনাস হিসেবেও পেতে পারেন! ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত যারা, তাদের জন্য এই কিটো ডায়েট মোটেও আদর্শ নয়। লিভার দুর্বল তো করবেই, পিত্তথলিতে পাথর, প্যানাক্রিয়াস সহ হজম শক্তি পর্যন্ত কমিয়ে দেবে। এতো গেলো শরীরের ভেতরকার সমস্যা। বাইরের কথায় একটু আসি- ত্বকের উজ্জ্বলতা হারানোর পাশাপাশি চুল পড়ে যাওয়ার আধিক্য দেখা দেবে! হরমোনাল ইম্ব্যালেন্স যাদের আছে, গর্ভবতি, দুগ্ধদানকারি মা, আর্থ্রাইটিসে ভোগা মানুষদের জন্যও এই কিটো ডায়েট আদর্শ নয়। মেয়েদের জন্য বলছি- ডায়েট শুরুর পূর্বে জেনে-বুঝে আগাবেন। সামান্য এদিক ওদিকে ঋতুস্রাবের সমস্যার পাশাপাশি বাচ্চা ধারণেও কিন্তু সমস্যা হতে পারে।
কিডনি রোগীদের কথা একটু না বললেই নয়। এই রোগীদের একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রোটিন খাওয়ার অনুমতি থাকে। কিটো ডায়েটে মাত্রার অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণের ফলে কিডনিতে চাপ পড়ে। দীর্ঘসময় এই চাপ নেওয়ার ক্ষমতা কিডনির থাকে না ফলে কিডনিতে পাথর হয়ে বিকল হয়ে যাওয়ার ঘটনা কিন্তু বিরল নয়।
পাঠক, একটু হলেও এবার হয়ত ধারণা পেয়েছেন যে কিটো ডায়েট আদতে সর্বসাকুল্যের জন্য নয়। এবং দীর্ঘমেয়াদের জন্যও আদর্শ নয়। আবার হুট করে ছেড়ে দিলে আগের চেয়ে বেশি হারে ওজন বেড়ে যাবে। মূলত এখনও পর্যন্ত কোন গবেষণায় কিটো ডায়েটের দীর্ঘমেয়াদী কিংবা সর্বসাকুল্যে গ্রহণযোগ্যতার বিষয় আবিষ্কৃত হয়নি। তাই একে পুর্ন নিরাপদ ভাবার আগে একটু ভাবতে হবে। ডাক্তার কিংবা পুষ্টিবিদ এর পরামর্শ ছাড়া ফেইসবুক, ইউটিউব এবং গুগলের উপর ভরসা করে নিজের শরীর নিয়ে এক্সপেরিমেন্টে না যাওয়ার অনুরোধ জানাবো। শরীরের চাহিদা অনুযায়ী ব্যায়াম, পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস তৈরি করুন। ভালো চিন্তা করুন এবং প্রফুল্ল থাকুন। বাজে চিন্তা এবং বাজে অভ্যাস থাকলে তা বাদ দিয়ে দিন। সুস্থতা হাতে এসে ধরা দেবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মানবজীবনের ৭টি বদভ্যাস এর তালিকা করেছে যেগুলো মানব মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর –
- সকালে কিছু না খাওয়া।
- রাতে খুব দেরিতে ঘুমানো।
- বেশি চিনি ও মিষ্টান্ন গ্রহণ।
- দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা।
- খাওয়ার সাথে টিভি দেখা, মোবাইল চালানো অথবা কম্পিউটার চালানো।
- ঘুমানোর সময় মাথায় কিছু দিয়ে ঢেকে রাখা- টুপি বা স্কার্ফ জাতীয়।
- প্রস্রাবের বেগ থাকা সত্ত্বেও আঁটকে রাখা।
সুস্থ জীবন যাপনের জন্য শরীরে কম বেশি সব ধরণের খাবারই কিন্তু দরকার হয়। শরীর যেহেতু আপনার, একে ভালো রাখার দায়িত্বটাও আপনার। আর তাই সিদ্ধান্তটাও আপনার।